আম্ফান চিনিয়ে দিলো মাননীয়াকে

সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকে পড়লাম যে মাননীয়া নাকি তার চেয়ার ছেড়ে দিতে চান কিন্তু চেয়ারের তাকে এত দরকার যে তিনি তা ছাড়তে চাইলেও পারছেন না। গাছের প্রাণ আছে আমরা সকলেই জানি কিন্তু চেয়ারের মরা কাঠে এতো ভালোবাসা, আবেগ একমাত্র তার পক্ষেই সৃষ্টি করা সম্ভব।অবশ্য এই আবেগের মধ্যে এক বিশাল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে: আম্ফান এর সুপার সাইক্লোনে যে কয়েক হাজার গাছ উপড়িয়ে গিয়েছে কলকাতা শহরে তাই দিয়ে তিনি এমন হাজার হাজার আবেগপ্রবণ চেয়ার বানিয়ে নিতে পারেন যারা তাকে আর ছাড়তে চাইবে না, তিনি তাদের নিয়ে মিউজিক্যাল চেয়ার খেলবেন যেমন তিনি তার ল্যাম্পপোস্ট মন্ত্রীদের নিয়ে করেন-আজ তিনি আছেন, তো কাল উনি, ইনি নেই, আবার উনিও নেই। তবে চেয়ার বানাতে কত বছর লেগে যাবে জানিনা, গাছ কাটতে কিন্তু সেনাবাহিনীকে ডাকতে হলো-যাদের একদা তিনি তোলাবাজ বলেছিলেন। পাশের রাজ্যের সাহায্য নিতে হলো। এসবে তার উন্নয়নের কি হাল হয়েছে তা তো বঙ্গবাসী সচক্ষে দেখতে পাচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবন ঝড়ে বিধ্বস্ত, প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। ওখানকার ম্যানগ্রোভ জঙ্গল সাফ করে ভেরি তৈরিতে দুষ্টু-মিষ্টি ছেলেদের (থুড়ি ভাইপোর) লাভ হয়েছে অনেক বেশি। তাতে যদি প্রকৃতির সাম্য নষ্ট হয় তাতে কি এসে যায়, কটা গরীব মানুষ ভিটেমাটি হারা হলে, মরলে কাদের কি?পৃথিবীর হেরিটেজ কোমর জলে দাঁড়িয়ে তাই তাদের আর্তনাদ করে বলতে হয় সরকার ত্রাণ দেয় না, তাদের বসবাসের ব্যবস্থাও করে না।
এবার কলকাতার কথা ধরা যাক। আমফান এর তাণ্ডবের সময়ে মাননীয়ার দপ্তর (এখানে বিদ্যুৎ মন্ত্রীর কথা বলে লাভ নেই কারণ তিনি একটি ল্যাম্পপোস্ট) বঙ্গবিভূষণ দান করা, লন্ডনের সফরসঙ্গী গোয়েনকাজির সিইএসসি কে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে, কয়েক ঘণ্টার জন্য, বলল না কেন?গাছের সাথে বিদ্যুতের পোস্ট জড়িয়ে বৈদ্যুতিক তারে যে মৃত্যু গুলো হল তা এড়ানো যেত। আম্ফানের তাণ্ডবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে 22 জনের। তাছাড়া গাছ চাপা পড়ে মৃতের সংখ্যা 27, দেওয়াল চাপা পড়ে মৃতের সংখ্যা 21। এরপরেও মাননীয়া বলবেন তার সরকার আমফান মোকাবিলা করার জন্য তৈরী ছিল? এমন বিপদজনক সুপার সাইক্লোন বাংলাকে বিধ্বস্ত করতে চলেছে এই খবর তো সপ্তাহখানেক আগে থেকেই ছিল। উন্নয়নের জোয়ারে তো রাজ্য ভেসে গিয়েছে মাননীয়ার অনুপ্রেরণায়, তার টাস্ক ফোর্স নাকি তৈরি ছিল, কর্পোরেশন, সব কন্ট্রোল রুম তৈরি ছিল, তা সত্ত্বেও কি হলো? যা হয়েছে তার ছবি আমরা কলকাতা, সুন্দরবন অঞ্চলে, পূর্ব মেদিনীপুর, উত্তর 24 পরগনা এবং দক্ষিণ 24 পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দেখতে পেয়েছি। ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা আমাদের আতঙ্কিত করেছে। কিন্তু মাননীয়ার কিছুই হয়নি, তিনি তার আদরের চেয়ারে বসে নাটক করে গিয়েছেন:”আমার মুন্ডু কেটে নিন”। মুন্ডু কাটা হবে কেন? প্রতিটা কাজের,কেন্দ্রের থেকে আসা কোটি কোটি টাকার হিসাব নেওয়া হবে, তারপর তার চেয়ার তাকে ছাড়বে। আসলে মাননীয়া বুঝতে পারছেন না-তার চেয়ারের তাকে দরকার নেই, সে কৈফিয়ৎ, হিসাব না নিয়ে ছাড়বে না। চেয়ার তাকে ভালবেসে ফেলেনি, চেয়ার এই রাজ্যের কোটি কোটি নীরবে চোখের জল ফেলা, নিদারুণ কষ্ট সহ্য করা মানুষগুলোর প্রতিভূ হয়ে ন্যায় বিচার চাইছে। আরফান যেমন উন্মুক্ত করে দিয়ে গিয়েছে উন্নয়নের মুখ তেমন একদিন তার এই চেয়ারও তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে-কারণটা মাননীয়া বুঝতে পারছেন না: লোভে, দম্ভে, মিথ্যাচারে, আস্ফালনে তার হৃদয়টা মরা কাঠ হয়ে গিয়েছে। মরা কাঠে দাহ করা যায়, ভবিষ্যতের অঙ্কুর ফোটানো যায় না। আরফানের তাণ্ডবে রাজ্যের 86 টি মৃত্যু এই অশনি সংকেত দিয়ে গিয়েছে।

Sender: লক্ষী রাণী সিংহ। সল্ট লেক। (কলকাতা)