পরিযায়ী শ্রমিক ও মাননীয়ার উদাসীনতা

“ওরা কাজ করে…
দেশে দেশান্তরে।
অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের..সমুদ্র নদীর ঘাটে ঘাটে,
পঞ্জাবে বোম্বাই গুজরাটে ।
ভাষাবিদ সুভাষ ভট্টাচার্যের মতে “পরিযায়ী” শব্দের উৎস সংস্কৃত “পরিযান” শব্দ থেকে। পরিযায়ী শব্দটি কমপক্ষে 2000 বছরের পুরোনো।শব্দটি এক ধরণের পাখিকে বোঝায়, যারা এক স্হান থেকে অন্য স্হানে যায় জীবন যাপনের প্রয়োজনে।মানব সমাজ কবে থেকে এই শব্দটি ব‍্যবহার করল বলা যায়না।ষোড়শ শতাব্দীতে স‍্যর টমাস ব্রাউন “Migrant” (পরিযায়ী) শব্দটি ব‍্যবহার শুরু করেন তার “Letter to a friend ” গ্রন্থে। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী এই শব্দের অর্থ “পাখি”।
ভারতে “The working group of migrants ” য়ের রিপোর্টে আইনজীবী ও মানবাধিকার কমিশনের সদস্য জয়তিকা কালরা’র মতে এই শব্দটি মোটেই সন্মানজনক নয়। এক্ষেত্রে “কর্মী” বা শুধু “শ্রমিক” বলাই ঠিক। কিন্তু এই আইনটি সংশোধন না হলে শব্দটির পরিবর্তন হবেনা। সত্তরের দশকে (1979) পরিযায়ী শ্রমিকদের বঞ্চনা রোধে “The Inter State Migrant Workmen” আইন চালু হয়। সেইসময় উড়িষ্যা ও অন‍্যান‍্য রাজ‍্যে “সর্দার ” বা “খাতাদার” নামক একদল মানুষ শ্রমিকদের শোষণ করত।2011 সালের জনগণনা অনুযায়ী সারা দেশে 45 কোটি প্রায় শ্রমিক ছিল।
এবার আসা যাক পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের কথায়। সাধারণত স্বাধীনোত্তর ভারতে বহু কল-কারখানা তৈরী হলেও সত্তরের দশক থেকে বহু কলকারখানা ক্রমাগত বন্ধ হওয়ায় বহু মানুষ এই রাজ‍্য থেকে ভিন রাজ‍্যে পাড়ি দেয় কাজ হারিয়ে। বর্তমানে তৃণমূল সরকার শিল্পের গুরুত্ব না বুঝে সিঙ্গুরে টাটার কারখানার বিরোধীতা করে। তার ফলে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের খুব ভাল একটা সুযোগ হারিয়ে যায়।অগত‍্যা বহু বেকার মানুষ এই রাজ‍্য থেকে অন্য রাজ‍্যে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে জীবনযাত্রা শুরু করে। শুধু কারখানা নয় বিভিন্ন ক্ষেত্রেও কাজ যারা করেন তারাও শ্রমিক। যেমন সুরাটে ও মুম্বাইতে প্রচুর শ্রমিক হীরা কাটা ও সেটিংয়ের মত সূক্ষ কাজও করে।
এই রাজ‍্যে শিল্প বলতে মুখ‍্যমন্ত্রী মমতা ব‍্যানার্জী বুঝিয়েছেন “চপ শিল্প ” “মুড়িভাজা শিল্প ” ইত্যাদি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব‍্যক্তিকেন্দ্রিক কাজকে, সমষ্টিকেন্দ্রিক শিল্প ঠাঁই পায়নি এই রাজ‍্যে।2011 সাল থেকে 2019 সাল অবধি এই রাজ‍্যে 5টি World Business Summits হয়েছে রাজকীয় আড়ম্বরে, এইসকল Summit’য়ে প্রায় 20 লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে ও বেশ কিছু নামী সংস্হা MOU স্বাক্ষর করেছে বলে রাজ‍্য সরকার ঘোষণা করে কিন্তু এখনো অবধি সেসব বিনিয়োগ ও শিল্পের কোনও নিদর্শন রাজ‍্যবাসী পায়নি। কোনও ভারি শিল্প এই রাজ‍্যে নতুন করে তৈরীই হয়নি।উপরন্তু বহু ছোট বড় মাঝারি শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। চা শিল্প, বহু পাট শিল্প এমনকি ডানলপ ফ‍্যাকট্রিও বন্ধ হয়েছে।বলতে গেলে এই রাজ‍্যে পরিযায়ী শ্রমিকের জন্ম দিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার আর ওদের ভিটে মাটি ছাড়া করেছে তৃণমূল সরকার।
সারাদেশব‍্যাপী অতিমারী “করোনা” যখন ছেয়ে যাচ্ছে তখন সময়মত Locked down ‘য়ের নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় সরকার।সময়মত এই সূচনাটা না পেলে আজ অনেক বেশি ভারতীয়কে করোনায় মরতে হত। এমতাবস্থায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পরিযায়ী শ্রমিক। কাজের অভাব, অন্নের অভাব, করোনা সংক্রমন সবকিছুকেই ভুলে তারা ঘরমুখো আজও। সেই এপ্রিল মাসে যখন কেন্দ্রীয় সরকার সব রাজ‍্যকে সব শ্রমিককে নিজ নিজ রাজ‍্যে ফিরিয়ে নিতে বলেছিল তখন বহুদিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনো সাড়া পাওয়া গেলনা। রাজ‍্য সরকার প্রথম থেকেই দায়িত্ব এড়াতে চেয়েছিল। তাই রেল মন্ত্রককে বুঝিয়ে দেওয়া হল পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিকদের ট্রেন ঢুকবেনা।
ইতিমধ্যে কেন্দ্র সরকার ব‍্যবস্হা করলেন শ্রমিকরা তাদের বাড়ি ফেরার পর দুই মাস প্রত‍্যেকেই 5kg চাল বা গম ও 1kg চানা বা ভাল পাবেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কেন্দ্র সরকার “এক দেশ এক রেশন কার্ড ” সব রাজ‍্যেকেই চালু করতে আহ্বান জানিয়ে ছিলেন বেশ কিছু মাস আগেই। এক্ষেত্রে শ্রমিকরা যে রাজ‍্যেই থাকুক না কেন সেই রাজ‍্য থেকেই রেশন তুলতে পারবে।মমতা ব‍্যানার্জী এই প্রথার বিরোধীতা করেছিলেন স্বভাবসিদ্ধ কারণেই। মাত্র একটি রেশন কার্ড হলে রেশন চুরি রোখা যাবে এতে সরকারি টাকা নষ্ট হবেনা এইটাই ছিল কেন্দ্র সরকারের উদ্দেশ্য।কিন্তু সেই নিয়ম এই রাজ‍্যে বিশ বাঁও জলে। এছাড়াও কেন্দ্র থেকে জানানো হয় 100 দিনের কাজ দেওয়া হবে শ্রমজীবীদের এবং যাদের বাড়িঘরের সমস‍্যা তাদেরকে বাড়িঘর সারানো বা বাড়ানোর বন্দোবস্ত করে দেবে ভারত সরকার ।
এদিকে দেশবাসীর সমালোচনার জেরে টুইট করে দিলেন মমতা ব‍্যানার্জী 105 টি শ্রমিক স্পেশাল ট্রেনের ব‍্যবস্হা করছেন,কিন্তু হায়…!! আজ 2’রা জুনেও সেই 105 টি ট্রেন পায়নি শ্রমিকরা।উনি আরও আশ্বাস দিয়েছিলেন পরিযায়ী শ্রমিকদের যথাস্হানে পৌঁছে দেবে ট্রেনগুলি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলনা। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক রাজ‍্যসরকার প্রদত্ত নোডাল অফিসার (IAS)পি. বি সেলিম’য়ের দপ্তরে ফোন করে করে হতাশ হয়ে গেল।কোনও উত্তর পেলনা। প্রচুর শ্রমিক নিজেরাই পথে নামল নিজের রাজ‍্যের উদ্দেশ্যে।পথে বড় বড় দুর্ঘটনায় কতজন মরল।কেউ কেউ বেঁচে গেল। সারাদেশে শ্রমিকদের নিয়ে দরদ উথলে উঠল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনও টেনশন নেই শুধু। স্বরাষ্ট্র সচিব অজয় ভাল্লার চিঠি পৌঁছল সমস্ত রাজ‍্যের মুখ‍্যসচিবের দপ্তরে। নির্দেশ এল কোনো শ্রমিক যেন পায়ে হেঁটে নিজের গন্তব্যে যেতে চেষ্টা না করে। তাদের জন‍্য বিশেষ ট্রেন ও বাসের ব‍্যবস্হা করা হবে। রেল আরও জানাল সারাদেশে দৈনিক 100 টা করে শ্রমিক স্পেশাল ট্রেন চালানো হবে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজ‍্যগুলির অনুমতি চাওয়া হলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নানা টালবাহানা শুরু করল। রাজ‍্য সরকারের কাছে সঠিক তথ‍্য চাওয়া হল, কিন্তু সরকারি অপদার্থতায় শ্রমিকদের সম্পর্কে রাজ‍্য বিশেষ কিছু তথ‍্য দিতে পারলনা। কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী মমতা ব‍্যানার্জীকে শ্রমিকদের ফেরানোর আর্জি বারবার জানালেন। ভারতীয় জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ‍্য সভাপতি শ্রী দিলীপ ঘোষ মুখ‍্যমন্ত্রীকে রাজনীতি ভুলে একসাথে এই উদ‍্যোগ নেবার আহ্বান জানালেন। মুখ‍্যসচিবকে চিঠি দিলেন ও 3.41 লাখ শ্রমিকের ডেটা দিয়ে সাহায্য করলেন ভারতীয় জনতা পার্টির কল সেন্টার থেকে। কোনো সমাধানই মিললনা।ওরা ভিটে-মাটির টানে শ্রান্ত অবসন্ন দেহেও পথ চলল যদি অন্তিম শ্বাসটাও নিজের ঘরে যায় যাক। বহু শ্রমিক বিভিন্ন প্রদেশের সরকার ও কেন্দ্র সরকারের আয়োজনে শ্রমিকদের জন‍্য খাদ‍্য ও অন্যান্য সুবিধাসহ বিশেষ স্হানে আশ্রয় পেল, অপেক্ষারত রইল ট্রেনে ওঠার জন‍্য। রেল মন্ত্রকের আর্জি ছিল রাজ‍্য সরকারের বিশেষ প্রতিনিধিরা যেন শ্রমিকদের টিকিট ও অন্য তথ‍্য (যেমন শ্রমিকদের ট্রেনে ওঠা নামার স্টপেজ খাদ্যাখাদ‍্যের তথ‍্য ইত‍্যাদি) নিয়ে যাত্রাগুলি পরিচালনা করেন.., কিন্তু এই রাজ‍্য সেটুকুও পারলনা। বহু ট্রেনকে নির্দিষ্ট স্টেশনে শ্রমিক যাত্রীদের জন‍্য অপেক্ষা করিয়েও ফিরিয়ে আনতে হয়েছে..এমন ঘটনাও জানা যায়।
সারা দেশে অতিমারীর প্রকোপ ক্রমবর্ধমান হল.., স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জী স্বয়ং চিঠি দিলেন মমতা ব‍্যানার্জীকে। প্রেস ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও সেকথা জানল। রাজ‍্য অবশেষে নড়েচড়ে বসল।
এরপর প্রচন্ড এক সাইক্লোন “আম্ফান” পশ্চিমবঙ্গের প্রচুর ক্ষতি করে গেছে। আম্ফান বিধ্বস্ত বাংলায় অনেক শ‍্রমিক এখন ফিরছে। তাদের জন‍্য ট্রেন থেকে নামার পর আজও উপযুক্ত খাদ‍্য জল শিশুদের জন‍্য কোনো বন্দোবস্ত নেই বললেই চলে।হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে ঠিকমত যানবাহন পায়নি বলে কোনো একটা বাস এলেই শ্রমিকদের মধ্যে ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে যায়, করোনা সংকটকালে এইরূপ ঘটনা ঘটা একেবারেই ঠিক না। এক্ষেত্রে Social distancing ‘য়ের প্রথাটাই লঙ্ঘিত হচ্ছে। এমনকি করোনা সন্দেহের শ্রমিকদের 14 দিন কোয়ারেনটিনে থাকার সঠিক ব‍্যবস্হাটাও ঠিকঠাক করা হচ্ছেনা। নেই শ্রমিকদের বাড়ি পৌঁছনোর পরিবহনের নির্দিষ্ট সময়। রাজ‍্যে প্রবেশ করেই এরা উপযুক্ত সুবিধার অভাবে ঘন ঘন বিক্ষোভ দেখাচ্ছে।মুখ‍্যমন্ত্রী কয়েকদিন আগে খুব বিরক্তির সাথে বলেছেন আম্ফান বিধ্বস্ত এই রাজ‍্যে এখনই এত শ্রমিক কেন ভারতীয় রেল ক্রমাগত পাঠাচ্ছে..,শ্রমিক ভর্তি ট্রেনগুলোকে উনি ছোঁয়াচে করোনা ব‍্যধি পূর্ণ “করোনা এক্সপ্রেস ” নাম দিয়ে ব‍্যঙ্গ করলেন অনায়াসে। পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি এই নিষ্ঠুর পরিহাসে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ক্ষুব্ধ।রাজ‍্যপাল শ্রী জগদীপ ধনকর মুখ‍্যমন্ত্রীকে টুইট করে “মানবিক” ও “সহানুভূতিশীল” হবার আবেদন করেছেন।
মুখ‍্যমন্ত্রীর মানবিকতার আঙ্গিকে বোঝা উচিত যে শ্রমিকরা ঘরে ফিরছেন তারা আমাদের আপনজন, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে কিছু সুবন্দোবস্ত করা উচিত।”কোরোনা আক্রান্ত “সন্দেহে অস্বাস্থ্যকর শৌচাগারে নির্বাসন ওদের প্রাপ‍্য নয়। রাজ‍্য সরকারের এই ব‍্যবহার বিবেক ও মনুষ্যত্ব হীন।অত্যন্ত হতাশাব‍্যঞ্জক।

লেখিকা-দেবারতি মিত্র (কলকাতা)