২০১৫ তে রাজ্য বিজেপির সহ সভাপতি কে ছিলেন? ২০১৬ তে রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক কে ছিলেন?

২০১৫ তে রাজ্য বিজেপির সহ সভাপতি কে ছিলেন?

২০১৬ তে রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক কে ছিলেন?

এই প্রশ্ন দুটো নিজেকে একবার ঝটপট করে নিন। এবার ৫ মিনিট সময় দিন নিজেকে। ভাবুন, উত্তর পেলেন? পেলেন? মনে পড়ছে নামগুলো? কি পেটে আসছে মুখে আসছে না! আচ্ছা ঠিক আছে…

এবার প্রশ্নটা পাল্টে দিই। এখন একজন বিজেপি রাজ্য সহ সভাপতির নাম বলুন, কিংবা একজন সাধারণ সম্পাদক? কি মনে পড়ছে? চিনতে পারছেন?

১৯৮৪ সালে আপনি কী করতেন? আমার তখন জন্ম হয়নি। কিন্তু আমাদের ঝাড়গ্রাম জেলার (তখন মেদিনীপুর ছিল) গোপীবল্লভপুরের একটি গ্রামের ছেলে তখন আরএসএস-এ যোগ দিয়েছিল। তারপর ১৯৮৪ থেকে ২০০৭ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছেলেটি ঘুরে বেড়িয়েছে। কোনও গরীব স্বয়ংসেবকের বাড়িতে রাত কাটিয়েছে তো কখনও রাস্তায়। যখন আপনি সমর্থ বাবা মায়ের টাকায় ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে চোখে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকা কিংবা ইংল্যান্ড পাড়ি দিচ্ছেন, তখন বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেটি ব্যস্ত ছিল আন্দামানে হিন্দুত্বের প্রচারে।

আন্দামান মানে তো আপনার আমার কাছে দু’দিনের হলিডে কিংবা হানিমুন ডেস্টিনেশন। কিন্তু এই ছেলেটি তার যৌবনের সোনালি বছরগুলো ত্যাগ করেছে ওখানে। কেন? হিন্দুত্বের আদর্শ প্রচারে। এই যে আজ বড় গর্ব করে বলেন আরএসএস বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিন্দু সংগঠন, এই যে গেল ৫ ই আগস্ট যখন অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ হল, বড় গর্বে ফেসবুকে পোস্ট করে গেলেন, এই যে আজ ৭ বছর হতে চলল দেশে হিন্দু দরদী সরকার। কিভাবছেন এগুলো আপনার/আমার ফেসবুক রচনার জন্য হয়েছে? এর পেছনে ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুরের ছোট গ্রামের ছেলেটিরও অবদান রয়েছে। এই ছেলেটি এবং এঁর মতো লক্ষ লক্ষ ছেলে (আরএসএস প্রচারক) নিজেদের বাড়ি ঘর ছেড়ে আন্দমান থেকে লাদাখ ভারতের যে কোনও প্রান্তে আধপেটা খেয়ে পড়ে থেকেছে বছরের পর বছর, তাই আজকের এই হিন্দুত্বের আন্দোলন তৈরি হয়েছে৷ তাই আজ আপনি জানতে পেরেছেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল পাঁঠাদের নাম, তাঁদের অবদান। নাহলে এঁদের তো ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা কম হয়নি…

আর আজ আপনি জমাটি চাকরি, ১০ লাখি প্যাকেজ নিয়ে এসি রুম থেকে বসে পোস্ট করছেন গোপীবল্লভপুরের গ্রামের ওই ছেলেটির থেকে আপনি বড় হিন্দুত্ববাদী! আর সেটা আমাকে মানতে হবে?

জ্ঞান সিং সোহন পালের নাম শুনেছেন? খড়্গপুর বিধানসভায় ওঁকে চাচা বলা হত। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে ভীষ্মের মতো যোদ্ধা ছিলেন এই জ্ঞান সিং সোহন পাল। জীবনে প্রথমবার নির্বাচন লড়ে যে লোকটা চাচাকে হারিয়ে দিলেন, তাঁর থেকে আপনি/ আমি বেশি রাজনীতি বুঝি?
কি বললেন রাজনীতিতে জয়টাই বড় কথা নয়?
তাহলে কি প্রতি নির্বাচন হেরে গিয়ে, শাহরুখ খানের মতো, ‘হার কে জিতনেওয়ালো কো…’ টাইপ বুলি আওড়ানো টা বড় কথা?
হেরে আর মরে যুদ্ধ যেতা যায় না। যে লোকটা রাজ্যে দুটো বড় নির্বাচন নিজের দমে জিতে এলেন তিনি রাজনীতি বোঝেন না?

২০১৬ থেকে ২০২০ – দিলীপ ঘোষ বিজেপি রাজ্য সভাপতি হওয়ার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে কটা নির্বাচন জিতেছে বিজেপি? আর তার আগে কটা? বিজেপির সমর্থক হিসেবে ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনটা আপনি জিততে চাইবেন? নাকি ওই ‘হেরে গিয়ে জিততে চাইবেন?’ আর জেতার জন্য সদ্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে ফেরা মহেন্দ্র সিং ধোনির উপর ভরসা করবেন নাকি রঞ্জিতে দারুণ ফল করা কোনও ক্রিকেটারের উপর? কাকে ক্যাপ্টেন হিসেবে দেখতে চান আপনারা?

একজন বড় স্কুল কলেজের বুদ্ধিজীবী মানুষকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখেছি আমরা, নন্দীগ্রামে গুলি চালানোর নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন না?

গড়গড় করে ইংরাজি বলতে পারা, কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ লিখতে পারা মুখ্যমন্ত্রী নাকি বন্যায় কাদাজল ঠেলে আপনার বাড়িতে চাল ডাল পৌঁছে দেওয়া মুখ্যমন্ত্রী?

নন্দনে নন্দনে ঘুরে মেলা খেলা করা মুখ্যমন্ত্রী নাকি আমফানের পর কাটারি হাতে রাস্তায় পড়ে থাকা গাছ কাটতে নেমে পড়া মুখ্যমন্ত্রী?

রাজ্যে জামাত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সামনে আসার পর চক্রান্তের অভিযোগ তোলা মুখ্যমন্ত্রী নাকি এরকম অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলেই, ‘গুলি করে দাও’ নির্দেশ দেওয়া মুখ্যমন্ত্রী?

মোরা একই ডিমে দুইটি কুসুমের মিথ্যে গল্প শুনিয়ে আসা মুখ্যমন্ত্রী নাকি টিভি চ্যানেলে সরাসরি বলে দেওয়া, ‘দেখুন মুসলমানকে মুসলমান থাকতে দিন, হিন্দুকে হিন্দু। খিচুড়ি বানাবেন না।’ বলা মুখ্যমন্ত্রী?

সারদা, নারদা যাঁতাকলের মুখ্যমন্ত্রী নাকি ৪ বছর ক্ষমতার অলিন্দে থেকেও দুর্নীতি স্পর্শ করতে না পারা মুখ্যমন্ত্রী?

NRC, CAA বিরোধী মুখ্যমন্ত্রী নাকি NRC, CAA করবই বলা মুখ্যমন্ত্রী?

পছন্দ তো রইলই আপনার কাছে, গ্রাম বাংলার মানুষের কাছেও।

যে নিরপেক্ষ নয় সে তার নিজের ইচ্ছাতেই নয়। প্রশাসন নিরপেক্ষ না হলে, পুলিশ কাস্টোডিতে কোনও শাসক বিরোধী দলের কর্মী মাথায় রক্তক্ষরণ হয়ে মারা গেলে সেই বিরোধী দলনেতা কী বলবেন? সেই বিরোধী দলনেতার কী বলা উচিৎ? যে বিজেপি সমর্থক বাড়িটি তার ছেলেকে হারাল সেই বাড়িটি দলনেতা দিলীপ ঘোষের কাছ থেকে কী শুনতে চাইবেন? দিলীপ ঘোষ ঠিক সেই কথাগুলিই বলেন। সাহস করে সপাটে বলেন। এখানেই উনি অন্যদের চেয়ে কয়েক’শ যোজন এগিয়ে।

আসলে দিলীপ ঘোষকে আপনারা সহ্য করতে পারেন না। গ্রামের গরীব বাড়ির একজন ছেলে নিজের দমে আপনাদের মতো এলিট ক্লাস বড়লোকদের প্রশাসনিক প্রধান হবেন! নন্দনে না গিয়ে, ছবি না এঁকে, পদ-পুরস্কারে বিকিয়ে যাওয়া কোনও বুদ্ধিজীবীকে তেল না মেরে জাস্ট নিজের দমে গ্রামবাংলার মানুষের সমর্থন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হবেন এটা আপনারা মেনে নিতে পারছেন না। এ লড়াই আসলে বহু পুরনো, এ লড়াই মহানগরীর ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের৷ এ লড়াই কলকাতার বাইরে গ্রাম বাংলা থেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার৷ এ লড়াই গ্রাম বাংলার আপামর চাষীর ছেলের নিজেদের প্রতিনিধিকে মুখ্যমন্ত্রী দেখার।

ওঁর যে কথাগুলো কলকাতার নন্দনগামী এলিট ক্লাস আপনার কাছে হাসির খোরাক সেগুলো আমার মতো গ্রাম বাংলার ছেলে মেয়ের রোজের পরিচিত কথা৷ শুধু দিলীপ ঘোষ নন গ্রাম বাংলার অনেক দুধ ব্যবসায়ী পরিবারই মনে করেন গরুর দুধে সোনা আছে। দুধ তাদের কাছে সোনার চেয়ে কম কিছু নয়৷ বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে থেকে ছোটো মেয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার খরচ গ্রাম বাংলার অনেক পরিবারই গরুর দুধ বেচে করে থাকেন৷ গরুর দুধ, আমার মতো গ্রাম বাংলার অনেক ছেলেমেয়ের কাছে সোনার চেয়ে কম নয়৷
গুজরাটের আমূল কোম্পানির দিকে তাকান তাহলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার বুঝতে পারবেন।

নন্দন ও ক্যাফে কফি ডে ছেড়ে বেরিয়ে আসুন। একটু খোঁজ খবর নিন। দেখুন বঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামের বিজেপি কর্মী-সমর্থকটির বাড়িতে হামলা হলে তাঁরা কোন নেতাটিকে পাশে চান। দলের সাধারণ বুথ স্তরের ঝামেলাতে কার কাছে সাহায্য চেয়ে ফোন আসে। কার একটা ফোনে দলে থেকে না থাকা হয়ে যান অনেক ভীমরুল।

মোদী ঝড়ের কথা মাথায় রেখেই বলছি, শেষ ১০ বছরে বঙ্গ বিজেপির একটাও দিলীপ ঘোষ ছিলেন না। আর তার জন্যই বোধহয় বঙ্গ বিজেপির সাংসদ সংখ্যা দু’অঙ্কে পৌঁছয়নি৷
ঝাড়গ্রাম তথা গ্রাম বাংলার নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে হিসেবে আমি আমার মতোই কাউকে আমার মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চাই,

২০২১ এ আমার মুখ্যমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ।

শেখর ভারতীয়।।