একুশে জুলাই: শহিদ স্মরণ না আত্মপ্রচারণা?

একুশে জুলাই—বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কলকাতা শহরের বুকে একটি অভিশপ্ত দিন। এই একটি দিন, মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে থাকে প্রতি বছর। যার আঁচ ছড়িয়ে পড়ে গোটা শহরে, স্টেশনে-স্টেশনে, শহরতলি ও গ্রাম-গ্রামান্তরে। একুশে জুলাই সাধারণ মানুষের ভোগান্তির একশেষ হওয়ার দিনে পরিণত হয়েছে। কলকাতার কেন্দ্রস্থলে তৃণমূল কংগ্রেস আয়োজিত জনসভায় জমায়েত করানো হয় লক্ষাধিক মানুষকে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে যাঁরা আসেন বা বলা ভালো, গায়ে ঘাসফুল আঁকা তেরঙা জড়িয়ে যে সব মানুষদের আনা হয়, তাঁরা কি আদৌ জানেন,কেন এই জনসভা? নাকি নিছকই দু-একদিনের কলকাতা ভ্রমণ আর পেটচুক্তি খাওয়াদাওয়া? অথচ এই মানুষগুলোকে আনার জন্য বাসের বন্দোবস্ত করতে গিয়ে জেলায় জেলায় দুদিন-তিনদিন ধরে দেখা পাওয়া যায় না যানবাহনের। বিপদে পড়েন সাধারণ মানুষ। রাজনীতি-মনস্ক, সমাজ-সচেতন নাগরিক মাত্রেই এই জনসভার উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। অবশ্য এই বছর করোনা মহামারীর প্রকোপের কারণে ভার্চুয়াল র‌্যালির কথা ভাবা হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে।

       কিন্তু কিসের জন্য এই জনসভা? কিসের শহিদ স্মরণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে সাতাশটা বছর।ভোট লুঠ, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্গতি, নির্বাচনে সচিত্র পরিচয়পত্রের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং বামফ্রন্ট সরকারের বিবিধ দুর্নীতি ও দুরাচারের বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রদেশ যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে  ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই, ‘মহাকরণ অবরোধ’ নামক এক কর্মসূচীর ডাক দেওয়া হয়। সাংসদ সৌগত রায় সহ তৃনমূল কংগ্রেসের বর্তমান অনেক সাংসদ,বিধায়ক,মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন সেদিনের সেই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে।কলকাতার প্রানকেন্দ্রে অবস্থিত মহাকরনকে ঘিরে পাঁচটি পয়েন্টে জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছিল।মাঝপথেই পুলিশ জমায়েত আটকালে যুব কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের খণ্ডযুদ্ধ বেঁধে যায়। লাঠি, টিয়ার গ্যাস ইত্যাদির পর গুলিও চালায় জ্যোতিবাবুর পুলিশ। মারা যান তেরো জন তরতাজা যুব কংগ্রেস কর্মী। প্রহৃত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও। এই ঘটনার পর থেকেই প্রদেশ যুব কংগ্রেস প্রতি বছর দিনটিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। অবশ্য ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস নামক নতুন দলের প্রতিষ্ঠা করেন। নাটকীয়তার শুরু এখান থেকেই। রাজ্যে একটিই শহিদ দিবস পালন হচ্ছে কিন্তু দু-ভাগে, দুভাবে। কংগ্রেস পালন করছে মেয়ো রোডে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে বা দলীয় দপ্তর বিধান ভবনে,আর তৃণমূল ধর্মতলার চৌরঙ্গীর মোড়ে। ২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এক অন্য মাত্রা পেয়েছে এই জনসভা। রাজ্যে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর বিজয় উৎসব স্থগিত রেখে এই দিনটিকে, শহিদ-স্মরণের মঞ্চকেই বেছে নেওয়া হয় বিজয়-উল্লাস প্রকাশ করার জন্য। আরও কত রঙ্গ-তামাশা ঘটে গেছে এই মঞ্চে, তার ইয়ত্তা নেই।

       ধর্মতলা, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, ময়দান চত্ত্বর এই সময় কার্যত চড়ুইভাতির চেহারা নেয়। যত্রতত্র জঞ্জাল,গ্যাস জ্বেলে মাংস রান্না, শয়ে-শয়ে বাস, সব মিলিয়ে দারুণ এক উৎসব যেন! ২০১৬ সালে এ-ও দেখা গেল, সমাবেশ ভরাট করতে আস্ত একটি বাইশ কামরার ট্রেনই ভাড়া করতে হল, আলিপুরদুয়ার থেকে! সাধারণ ট্রেনে তো প্রতি বারই ভোগান্তি লেগে থাকে। অথচ, এই ধর্মতলাতেই বিজেপির জাতীয় সভাপতি শ্রী অমিত শাহের জনসভার অনুমতি পেতে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। আর কী দেখতে জমায়েত হয় মানুষ? জনপ্রিয় টলিউডি অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তো থাকেনই। মাননীয়ার অনুপ্রেরণায় বা তাঁর নির্দেশ থাকলে ‘পাগলু ডান্স’-ও চলে শহিদ স্মরণের মঞ্চে। এছাড়াও অন্যান্য দল ভাঙিয়ে যে-সমস্ত নেতাদের তৃণমূলে আনা হয়, তাঁদেরও ওইদিন আনুষ্ঠানিক যোগদান করানো হয়। নাচ-গান মিলিয়ে সম্পূর্ণ বিনোদন মজুত থাকে উক্ত মঞ্চে। সবশেষে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর এক আদ্যোপান্ত অগোছালো দীর্ঘ বক্তৃতায় কখনও ভেসে আসে রাজনৈতিক হুমকি, কখনও শতাধিক মনগড়া প্রকল্পের আশ্বাস, কখনও ভোটভিক্ষা, কখনও দলীয় নেতাকর্মীদের মিষ্টি ধমকধামক ইত্যাদি। যে সারদা-নারদা কাণ্ডে হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আত্মঘাতী হয়েছে, সেই সব কাণ্ডে অভিযুক্ত বা জামিনে ছাড়া পাওয়া বিভিন্ন মুখ দেখা গেছে এই মঞ্চে, তাদের বক্তৃতাও শোনা গেছে। খোদ মুখ্যমন্ত্রীই তাদের স্বপক্ষে গলা চড়িয়েছেন এই মঞ্চ থেকে। সমাবেশের এই মঞ্চ বাঁধা হয় রীতিমতো খুঁটিপুজো করে! ইতিহাসে এটাই প্রথম শহিদ স্মরণের মঞ্চ, যা বাঁধার আগে খুঁটিপুজো করতে হয়। মাননীয়া একাধিক বার একুশে শব্দটির গুরুত্ব নানানভাবে বোঝাতে চেয়েছেন। একুশে মানেই লড়াই, একুশে মানেই বিপ্লব, একুশে মানেই শহিদ, একুশে মানেই ভাষা, ইত্যাদি! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, এঁরা সূক্ষ্মদেহে এই মঞ্চেই থাকেন।  খুবই ভালো কথা, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ‘পাগলু ডান্স’ নাচের সময়, রাজনৈতিক হুমকি-টুমকি দেওয়ার সময় এই ঐতিহ্যের কথা মাথায় থাকে না তাঁর। আপাদমস্তক দুর্নীতিপরায়ণ একটি রাজনৈতিক দলের দলীয় সমাবেশে জেল ফেরত নেতাদের যে সভা আলো করে বসে থাকতে দেখা যায়, সেই মঞ্চকে একুশে বলে উল্লেখ করলে, সেই মঞ্চ থেকে রবীন্দ্র-নজরুল আওড়ালে বাঙালি হিসেবে ঘেন্না হয় আমাদের। ‘ঐতিহাসিক’ এই বিনোদনমূলক রাজনৈতিক সমাবেশে যা যা দেখা যায়, তা একমাত্র তৃণমূলী সংস্কৃতিতেই সম্ভব। শহীদ দিবসের মহতী মঞ্চকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য লাগানো মানে সুষ্ঠু সভ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বস্ত করা। অবশ্য তৃণমূলী রাজনীতি তো এই ঐতিহ্যেরই ধারক ও বাহক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কেরিয়ার এই সংস্কৃতিরই পরিচায়ক।

       আমরা দেখতে পাচ্ছি, শহিদ স্মরণের নামে এই সমাবেশ প্রহসনে পরিণত হয়ে বছর বছর অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। একটি রাজনৈতিক দল এই মঞ্চ থেকে কেবলমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা তুলে চলেছে, আর কিছুই নয়। কিন্তু কেন এই নিরর্থক উদ্‌যাপন? আমরা কোনও সংগত কারণ খুঁজে পাইনা। প্রথমত, ১৯৯৮ সালে অর্থাৎ উক্ত ঘটনার পাঁচ বছর বাদে শ্রীমতী বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস স্থাপন করেছেন। ঘটনাটি আদতে ঘটেছে কংগ্রেসের সঙ্গে। সেখানে তৃণমূলের কী ভূমিকা? হতে পারে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন ও প্রহৃত হয়েছিলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে দিনটিকে স্মরণ করতেই পারেন। কিন্তু প্রতি বছর শহিদ স্মরণ ভাঙিয়ে রাজনৈতিক সমাবেশ কখনই যুক্তিযুক্ত নয়। আসলে এই প্রহসনের রাজনীতি দিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণ মানুষ ও তাঁর বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর তৃণমূলের ভয়াবহ অত্যাচারের কাহিনীকে আড়াল করতে চাইছেন। নাহলে, তিনি কখনও-ই ২০১১-র বিজয় উৎসবকে এই দিনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতেন না। তেরোটি নিরীহ প্রাণ সেদিন অকালে ঝরে গিয়েছিল রাজ্য-পরিচালিত পুলিশ-প্রশাসনের হাতে। তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচয় নতুন করে না দিলেও তারা রাজনীতির নামে সর্বতোভাবে যে দাঙ্গা, রক্তক্ষয়ী নীতির আশ্রয় নিয়েছে, তাতে ঐ সকল শহিদদের স্মরণ করার নৈতিক অধিকার তাদের আছে বলে মনে হয় না। যে রাজ্যের প্রতিটি পুলিশ স্টেশন শাসক দলের দলীয় কার্যালয়ে পরিণত হয়ে যায়, সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শহিদ দিবস পালন করা নিতান্তই হাস্যকর। সুবিধাবাদ, পক্ষপাতিত্বের রক্তমাখা হাতে পবিত্র জীবনের স্মৃতি-তর্পণ মানায়? কালক্ষয়ী এই বর্তমান দুর্যোগে, মহামারীতেও এই সরকার ক্রমাগত জনসাধারণকে শহিদ হওয়ার পথে ঠেলে দিচ্ছেন। রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চূড়ান্ত অব্যবস্থার কোপে পড়ে প্রতিদিন যে হাজার হাজার মানুষ এই মহামারীতে শহিদ হচ্ছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে কি পারবেন তাঁদের প্রত্যেকের জন্য ধর্মতলার মোড়ে শহিদ স্মরণ করতে?পারবেনই বা কী করে? মৃতদের সঠিক তথ্যই তো তিনি প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক। তবে এই নিয়ে তিনি রাজনীতি করছেন বা ভবিষ্যতেও করবেন, ওই যে বলা হল, মরদেহ নিয়ে রাজনীতি করাটাই তার সংস্কৃতি। যে বামফ্রন্ট সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি লড়েছিলেন, ১৩ জন শহিদ হলেন, যে দুর্নীতির প্রতিপক্ষ হয়ে তিনি ক্ষমতায় এলেন— কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তিনি সেই ‘লাল সন্ত্রাস’-রই নামান্তর ‘তৃণমূলী সন্ত্রাস’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ক্ষমতার বলে প্রতিটি বিরোধী জনস্রোতের গতি স্তব্ধ করে চলেছেন। কটা জনমিছিল তাঁর ক্ষমতার অলিন্দ অবধি পৌঁছতে পেরেছে আজ অবধি? পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেস যেভাবে সমার্থক হয়ে উঠছে, তাতে গণতন্ত্রই অতি শীঘ্র শহিদ হয়ে যাবে।

       ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর গুলিচালনা কাণ্ডের তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিঃসন্দেহে একটি শুভ উদ্যোগ। কিন্তু তারপর? সেই তদন্তের কোনও অগ্রগতি হল? না। ২০১৪ সালে হাইকোর্ট জানতে চাইলেন, আন্দোলনের প্রধানকে ডাকা হচ্ছে না কেন? কমিশন নীরব। ইতিমধ্যে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সাক্ষ্য দিয়ে এসেছেন। কিন্তু আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তার কোনও সাক্ষ্যই নেই! তিনি হয়তো তখনও শহিদ স্মরণে ব্যস্ত! শেষমেশ ২০১৯ সালে বিরোধী পক্ষের আইনজীবী আদালতে এই মামলা খারিজ করে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন কারণ তিরিশ জন অভিযুক্তের কাউকেই প্রকৃতভাবে শনাক্ত করা যায়নি। অথচ ‘একুশে জুলাই’-র মঞ্চ থেকে প্রতিবছর শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রবর্তিত ‘একুশে আইন’ রাজ্যবাসীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন!

বিগত প্রায় এক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে যে রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর সন্ত্রাস ও কর্মীদের হত্যালীলা তৃণমূল দল সংঘঠিত করে চলছে তারপরেও কি তাদের শহীদ দিবস পালন করার কোনো নৈতিক অধিকার থাকে? গত ৯ বছরে তৃণমুলী সন্ত্রাসে আমাদের দলের শতাধিক কর্মী শহীদ হয়েছেন। আমাদের দলের বিধায়ক দেবেন্দ্রনাথ রায়ের খুনের কোনও কিনারা আজ অবধি হয়নি। কয়েক দিন আগেই নদীয়া জেলায় খুন হয়েছেন আমাদের দলের কর্মী বাপী ঘোষ। তাই আমাদের আজ শপথ করতে হবে যে আমরা যতদিন না তৃণমূলের এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটাবো ততদিন আমাদের সংগ্রাম চলবে। মাননীয়া আর তাঁর দল যতই আমাদের উপর আক্রমণ চালান, পশ্চিমবাংলাকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত আমরা করবই। আর সেটাই হবে শহীদদের উদ্দেশ্যে যথাযোগ্য শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্মৃতিচারণা।