মহালয়াকে কি সত‍্যিই শুভ বলা যায়??

লেখিকা -দেবারতি মিত্র

বলুন তো মহালয়ার সঙ্গে পূজোর কি কোনও সম্পর্ক আছে?? জানি কেউ বলবেন এই দিনের পর পরবর্তী ষষ্ঠ দিনেই দুগ্গাপুজো শুরু। তাই একটা আনন্দের সূচনা ও প্রতীক্ষার নিবৃত্তি এই দিনটাতেই মনে করে সবাই।
কেউ বলবেন বেতারে “মহিষাসুরমর্দিনী” এই দিনই বাজে। তাহলে কেন মহালয়ার সাথে দূর্গাপূজার Link হবেনা??!!
আবার কেউ বা যুক্তি দেবেন মহালয়া মানেই তো দেবীর আগমনের শুরু। পূজো শুরু। মা দুর্গার মুখের ছবি দিয়ে ‘শুভ মহালয়া’ লিখে কত ছবি আদানপ্রদান হয় এই দিন।
জানেন মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপূজোর আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। “শুভ মহালয়া” শব্দদ্বয়ের কোনও অর্থই হয়না। মহালয়া দিনটা বরং ভারি দুঃখের।

রেডিওতে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামের একটি অনুষ্ঠান পরিবেশন করাই শুধু হয়েছিল ওই দিনটাতে আর তারপর অনুষ্ঠানটি মানুষ এতটাই গ্রহণ করেছিল যে মানুষের মনে”মহিষাসুরমর্দিনী”মহালয়ার প্রাতেই শোনার নিয়মের মত হয়ে গেছে। পরবর্তীকালে টেলিভিশনেও নৃত‍্যগীত সহযোগে ওই অনুষ্ঠানের নকল করে দেবী দূর্গার নানান কাহিনীমূলক অনুষ্ঠানও এখন দেখানো হয়, কিন্তু সেই সবের সাথে ” মহালয়া” তিথির (অমাব‍স‍্যা)কোনোই সম্পর্ক নেই। এই দিনে অনুষ্ঠানগুলি সম্প্রচার হয়, এই পর্যন্ত।

মহালয়া কথাটি এসেছে ‘মহত্‍ আলয়’ থেকে। হিন্দু ধর্মে মনে করা হয় যে পিতৃপুরুষেরা এই সময়ে পরলোক থেকে ইহলোকে তাদের গৃহ বা আলয়ে জল ও খাদ‍্যের আশা করে পরিবারের কাছে আসেন।
পিতৃপুরুষদের জল ও খাদ‍্য(পিণ্ড) প্রদান করে ‘তৃপ্ত’ করা হয় বলেই মহালয়া একটি পূণ্য তিথি কিন্তু হারিয়ে যাওয়া পিতৃ -মাতৃ দেব দেবীর স্মরণ ও শোকের দিন।

এছাড়াও আর একটি ঘটনার উল্লেখ করলে এই দিনটির প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশি বোঝা যাবে।

অর্জুনের তীরে মৃত্যুর পর কর্ণের আত্মা পরলোকে গমন করার পর তাঁকে খাদ্য হিসেবে স্বর্ণ ও রত্ন দেওয়া হয়েছিলো। কর্ণ এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাঁকে বলা হয়, তিনি সারা জীবন স্বর্ণ ও রত্ন দান করেছেন, কিন্তু প্রয়াত পিতৃগণের উদ্দেশ্যে কখনও খাদ্য বা পানীয় দান করেননি। তাই স্বর্গে খাদ্য হিসেবে তাঁকে সোনাই দেওয়া হয়েছে।

দুঃখিত কর্ণ জানান তাঁর পিতৃপুরুষ কারা সেটাই তো তিনি মৃত্যুর মাত্র একদিন আগেই জানতে পেরেছিলেন। তাঁর কিই বা করার আছে??যমরাজ কর্ণের অপারগতা উপলব্ধি করেন এবং কর্ণকে এক পক্ষকালের জন্য মর্ত্যে ফিরে পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল দেওয়ার অনুমতি দেন।

এই পক্ষই পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত হয়। আর পূর্ব পুরুষকে পিন্ড (খাদ‍্য) ও জল দেবার মত পুণ‍্য কর্মের দিন এই দিনটিকেই ধার্য‍্য করা হয়। কর্ণ যেহেতু এই দিনেই এই মহৎ কাজটি করেছিলেন। হিন্দুরা এই পুণ‍্য কর্মটিকে তর্পণ নামে অভিহিত করেন যুগ যুগ ধরে প্রথাটি সকলের বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের তিথি হিসেবে এই দিনটি তাই দুঃখের।একে শুভ বলা ঠিক নয়।