ঠিক এই জন্য ভদ্রলোককে সমর্থন করি। উনি গরীবের ঘোড়া রোগটি ধরতে পেরেছেন এবং সেটি সপাটে বলেছেন।

ঠিক এই জন্য ভদ্রলোককে সমর্থন করি। উনি গরীবের ঘোড়া রোগটি ধরতে পেরেছেন এবং সেটি সপাটে বলেছেন।

একটা ছোট অভিজ্ঞতা বলে দিই এই প্রসঙ্গে,
ইংরাজি সাহিত্যে এম এ শেষ করার পর ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যে কোনও একটিতে এমএ করব বলে মনস্থির করলাম। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানেই এগোলাম, ফর্ম তুলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দূরশিক্ষায় ভর্তি হলাম৷ পড়াশুনো শুরু করলাম। পাশাপাশি তখন চাকরির পরীক্ষার জন্য পড়ছি৷ হঠাৎ কী মনে হল আমি, নীলিমা চক্রবর্তী, তন্ময় জানা আমরা কলকাতা থেকে ক’জন দিল্লী গেলাম একটি চাকরির কোচিং সেন্টারে ২১ দিনের একটা মকটেস্ট ওরিয়েন্টেড স্পেশাল কোর্স করতে। কোচিংটিতে প্রথম দিন ক্লাস শুরুর আগে সবার পরিচয়পর্ব চলছিল। (ওখানকার কথোপকথনটা বাংলায় তুলে ধরলাম।)

  • আপনাদের মধ্যে কে কে শুধু উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে চাকরির জন্য কোচিং নিতে এসেছেন?
  • দেখলাম রুমে থাকা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অন্তত ৪৫% হাত তুলল। আমরা যারা কলকাতা থেকে গেছি তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতাটা বলে দিই। নীলিমা এম টেক (সম্ভবত), তন্ময় ( ভূগোলে এমফিল করছিল সম্ভবত)। আমি ডাবল এমএ শুরু করেছিলাম। আমরা অহঙ্কারের হেয় দৃষ্টিতে এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। একটা হালকা বাঁকা হাসি হেসে মনে মনে বললাম হেঁ হেঁ হেঁ উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে এসেছে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে, হেঁ হেঁ হেঁ…
    দিল্লীর কোচিংয়ের শিক্ষকটি আবার প্রশ্ন করলেন,
  • শুধু গ্র্যাজুয়েট হয়ে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে এসেছেন এরকম এখানে কে কে আছেন?
  • ক্লাসের মোট ছাত্র ছাত্রীর প্রায় ৫০ শতাংশ হাত তুলল এবার। আমি, তন্ময়, নীলিমা ছাড়া আর বোধহয় গোটা সাতেক ছেলেমেয়ে বাকি রইল ক্লাসে।
    কোচিংয়ের প্রশ্নকর্তা শিক্ষকটি আবার প্রশ্ন করলেন,
  • এম এ করে এখানে চাকরি পরীক্ষার কোচিং নিতে এসেছেন এরকম কারা কারা আছেন?
  • এবারে আমরা তিনজন ছাড়া বাকি সাতজনও হাত তুলে দিল।
    এবার প্রশ্নকর্তা আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
  • এমএ ছাড়াও অন্য ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেছেন বা পড়ছেন এরকম কে কে আছেন এখানে?
  • আমাদের ছাতি ততক্ষণে ফুলে ৬৫ + হয়ে গেছে। মনে মনে ভাবছি এই অশিক্ষিতদের দলে এক্কেবারে বিদ্যাসাগর আমরা। চওড়া ছাতি ও ছলকে পড়া আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমরা তিনজন এবার হাত তুললাম। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অহঙ্কারের বেলুনে বিমানবাবুর মতো আলপিন ফুটিয়ে দিয়ে শিক্ষকমশায় বললেন,
  • আপনাদের চাকরি পাওয়ার লড়াইটা সবচেয়ে কঠিন!
  • আমরা তো হতবাক, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ইনি বলেন কি! আমরা যাকে বলে এত এত ডিগ্রি নিয়ে এসেছি, এদের থেকে বেশি পড়াশুনো, আর এ বলে আমাদের লড়াই সবচেয়ে কঠিন! এবার শিক্ষক মশায় আমাদের ‘মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্নের সামনে পড়া wbcs অফিসারদের মতো মুখের অবস্থা’ দেখে হাসলেন। তারপর বললেন,
    আপনারা যে চাকরির পরীক্ষায় উচ্চমাধ্যমিক কিংবা গ্র্যাজুয়েশনের পর বসতে পারতেন সেটায় বসার জন্য ৫ বছর সময় নষ্ট করে এলেন। নিজেরাই নিজেদের পাঁচটা বছর পিছিয়ে দিলেন। তারপর সে বছর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সফলদের তালিকা বের করলেন। দেশে ১ থেকে ৪০ এর মধ্যে RANK করা ৩ জনের ভিডিও ইন্টারভিউ দেখালেন। যেখানে তাঁরা জানিয়েছেন ইতিহাসে মাত্র ৪৭ শতাংশ নম্বর নিয়ে সাধারণ গ্র্যাজুয়েট তাঁরা। গ্র্যাজুয়েশনের শুরু থেকে অর্থাৎ উচ্চমাধ্যমিকের পর থেকেই চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। ওই সময় থেকেই নিয়েছিলেন কোচিং।

এম এ, ডাবল এম এ, এম ফিল, পিএইচডি…
আমাদের ডিগ্রি পেতে চাওয়ার ক্ষুধা, এবং সেটা নিয়ে ফাঁকা গর্ব (এর পেছনে রয়েছে অভিভাবক তথা আমাদের রাজ্যের সামাজিক মানসিকতা) সারা দেশের চাকরি পরীক্ষায় আমাদের রাজ্যকে পিছিয়ে দিচ্ছে। কম্পিটিটিভ মানসিকতাই তৈরি হয়নি আমাদের৷

আমি বলছি না এম এ, ডাবল এম এ, এম ফিল, পিএইচডি করা অন্যায় বা ভুল। অবশ্যই করা উচিৎ। যাঁদের যোগ্যতা ও ইচ্ছা রয়েছে তাঁরা অবশ্যই করুন। যারা গবেষক, অধ্যাপক হতে চান তাঁরা করুন। কিন্তু যে ছেলেটি/মেয়েটি কম্বাইন্ড ডিফেন্স সার্ভিসে বসবে, যে ছেলেটি CGL (কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল), রেল, মাল্টিটাস্কিংয়ের মতো চাকরির পরীক্ষা পাশ করতে চায়, সে কেন এম এ /ডাবল এম এ-এর জন্য ২-৩ টে বছর নষ্ট করবে?
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বললে,
‘শিক্ষাকে বহন নয় বাহন করিতে হবে’। না হলে ডিগ্রির অহঙ্কার ছাড়া কোনও মূল্য নাই। এ জন্যই মাঝে মাঝে সংবাদপত্রে হেডলাইন হয়,
‘ এমফিল/পিএইচডি এবার আবেদন করলেন মৎসমন্ত্রকের গ্রুপ-ডির চাকরির জন্য।’

দিলীপ ঘোষ সাহসী, তাই তিনি সপাটে সহজ ভাষায় মিথ্যে আঁতলামির গ্যাস বেলুনটা ফুটো করে দিয়েছেন। ডিগ্রির বোঝা বয়ে বেড়ানো একজন ছাত্র হিসেবে দিলীপ ঘোষকে অসংখ্য ধন্যবাদ৷ আপনি এভাবেই চালিয়ে খেলুন স্যার। বাংলার রাজনীতি অনেকদিন এরকম মেঠো সুর শোনেনি…

পুনশ্চঃ
‘তুমহারে পাপা গাধো কি ফ্যাক্টরি চলা রহে হ্যায়। ওর ইয়ে দেখো (সুহাসের দিকে আঙ্গুল তুলে) ইয়ে এক গাধে, তুমহারে পাপা কি ফ্যাক্টরি সে। যো পহলে ইঞ্জিনিয়ারিং কিয়া, ফির এমবিএ ওর অব লন্ডন যাকে ব্যাঙ্ক মে নৌকরি কর রহা হ্যায়…
অগর ব্যাঙ্ক মে হি নৌকরি কর না থা তো ইঞ্জিনিয়ারিং কিউ কিয়া?’

থ্রি ইডিয়টস সিনেমার এই দৃশ্যটার কথা মনে আছে? যেখানে ভাইরাস লেখা ইনভাটার নিয়ে র‍্যাঞ্চোরূপী আমির খান মলে হাঁটছে, তাঁকে দেখে ভাইরাসের মেয়ের চরিত্রে থাকা করিনা তার পিছু নিয়ে ভাইরাস লেখা ইনভাটারটি র‍্যাঞ্চোর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। তারপর কথা প্রসঙ্গে করিনার সঙ্গে থাকা সুহাসকে ( সিনেমায় করিনার ফিয়ান্সে)দেখিয়ে এই কথাগুলো বলে র‍্যাঞ্চো।

তখন খুব মজা লেগেছিল তো কথাগুলো শুনে? হাততালিও দিয়েছিলেন? আহা বাহা করেছিলোন?
কারণ ওগুলো বিধু বিনোন চোপড়ার সিনেমায়, জিনিয়াসের রোল প্লে করা আমীর খান বলেছিলেন। এবার এই কথাগুলোই আরও সহজভাবে দিলীপ ঘোষের মুখে শুনতে কষ্ট হচ্ছে? অবাক না?

শেখর দুবে।