নারী-জাগরণ ও বিদ্যাসাগর

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, রামকৃষ্ণের পর, আমি বিদ্যাসাগরকে অনুসরণ করি। বঙ্গদেশে নারী শিক্ষার বিস্তারে যে সকল কতিপয় মানুষ নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অবদান তুলনাহীন। তদানীন্তন ইংরেজ শাসকরা ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে থাকলেও কিছু উদারমনস্ক ইংরেজ শাসক নারী শিক্ষার সূচনা করেন। কিন্তু বিদ্যাসাগরই ছিলেন বাংলা তথা ভারতের নারী শিক্ষা বিস্তারের প্রধান কারিগর। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তিধারি সমাজসংস্কারক ছিলেন বাংলায় নবজাগরণের প্রতিমূর্তি। একদিকে লোভী উপনিবেশকারী ইংরেজের আগ্রাসন আর অন্য দিকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ, সব মিলিয়ে দেশ এক বিরাট বিপর্যয়ের সম্মুখীন। আর ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করেছিলেন একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই ভারতীয় নারীর মুক্তিলাভ সম্ভব। নারীর উন্নতি বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় সে কথা তিনি বুঝেছিলেন, তাই যে কাজ মহান সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায় শুরু করেছিলেন, সেই নারী শিক্ষার বিস্তারের আসল কাজ বিদ্যাসাগরই করেছিলেন। শুধু তাই নয়, বিদ্যাসাগর মহাশয় দীর্ঘকাল সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন এবং সেখানে কাজ করার সময়ে তিনি শিক্ষার ক্ষেত্রে অগাধ অবদান রেখেছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার পঠনপাঠন সহজ করার জন্য বর্ণ পরিচয়ের সৃষ্টি করেন। তবে এটি নারী সমাজের উন্নতি সাধনের ক্ষেত্রে তাঁর মহতি অবদান আজ তাঁর বৃহত্তম উত্তরাধিকার হিসাবে আমাদের সামনে জাজ্বল্যমান।

মধ্যযুগ থেকে একগুচ্ছ কুপ্রথায় সমাজ ছিল জর্জরিত। বাল্যবিবাহ, গৌরীদান, পর্দাপ্রথা, সতীদাহ, দেবদাসী, জওহর প্রথা ইত্যাকার নানান বর্বর প্রথায় দেশ ভরে উঠেছিল। সম্পত্তির ভাগীদার যাতে কম হয়, সে কারণে পরিকল্পিতভাবে এক জঘন্য প্রথার উদ্ভব হয়, তার নাম সতীদাহ। স্বামী মারা গেলে তার চিতায় উঠিয়ে দেওয়া হত তার জ্যান্ত স্ত্রীকে। সে তখন মাদকের নেশায় আচ্ছন্ন। তার গগনভেদী কান্নার রোল চাপা পরে যেত ঢাক-ঢোলের উচ্চ উল্লাসে। নারকীয় এক উৎসব হত চিতা ঘিরে। এর বিরুদ্ধে বহু লড়াই করে অবশেষে ১৮২৯ সালে রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অবলুপ্তি ঘটে এই প্রথার।

কিন্তু নারীর দুর্দশা কি কেবল এইটুকুই ছিল? বাল্যবিবাহ বা গৌরীদানের মতো প্রথাগুলি কিন্তু আজও সমাজে দেখা যায়, আইনবিরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সেকালে তো এইটিই মূল বিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। বাল্য অবস্থাতেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বয়সে চারগুণ বড় পাত্রের সঙ্গে। আর যদি কুলীন ঘর হয়, তবে মরণাপন্ন বৃদ্ধের সঙ্গেও বিয়ে হয়ে যেত ছোট্ট ছোট্ট মেয়েদের। কন্যাদায় সে সময়ে সমাজের সর্বোচ্চ দায় ছিল। কালের নিয়মেই বিবাহের অনতিকাল পরেই পাত্র মারা গেলে মেয়েদের কপালে জুটত অশেষ দুর্গতি। মস্তক মুণ্ডন করিয়ে, সাদা কাপড় পরিয়ে, সমগ্র সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা পরে থাকতো ঘরের অন্ধকারে। ছিল না শিক্ষা, ছিল না সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার। যে ভারতবর্ষে বৈদিক যুগে প্রাপ্তবয়সে কন্যারা স্বয়ংবরা হতেন, যে ভারতবর্ষে ঋষিকন্যা নিজের বিবাহমন্ত্র নিজে লিখেছিলেন, যে ভারতবর্ষে লোপামুদ্রা, মৈত্রেয়ীর মতো বিদুষীরা জন্ম নিয়েছিলেন, সেই ভারতবর্ষেই কোটি কোটি বালারা এইভাবেই সামাজিক হত্যার শিকার হয়েছে।

জ্ঞানের সাগর, বিদ্যার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র সম্যকভাবে শাস্ত্রমর্ম উদ্ধার করে এই সকল প্রথার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন ভারতবর্ষের স্বার্থে। যে দেশে কুমারী শক্তির অপ্রতিম প্রকাশরূপে পূজিতা হন, সেই দেশে এই বর্বরোচিত প্রথা প্রযোজ্য নয়, এই সার তিনি অনুধাবন করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল নারীদের শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক উন্নীতকরণ করা। কুসংস্কারের ঘন আচ্ছাদন সরিয়ে সমাজের সংস্কার করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

কিন্তু বেথুন সাহেব যখন নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য উদ্যোগী হন তখন তাঁকে কুসংস্কার সম্পন্ন ভারতীয় সমাজের মুরুব্বিরা পদে পদে বাধা প্রদান করে আর ঠিক তখনি তাদের সমস্ত চোখরাঙানিকে অগ্রাহ্য করে বিদ্যাসাগর মহাশয় ও তাঁর প্রিয় বন্ধু মদনমোহন তর্কালংকার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বেথুন সাহেবের অনুরোধে তিনি বিদ্যালয় পরিচালনা করার জন্য অবৈতনিক সম্পাদকের ভার গ্রহণ করেন এবং ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এটি ছিল ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় যেটি বর্তমানে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত।

সেই যুগে নারী শিক্ষার সব থেকে বড় বাধা ছিল অসচেতনতা। বিভিন্য রকম গুজব সমাজে প্রচলিত ছিল যেমন স্ত্রী পড়াশুনা করলে স্বামী অল্প বয়সে মারা যাবে। কিন্তু বিদ্যাসাগরের পরিকল্পনা ছিল সুদরপ্রসারী তাই তিনি এসব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে নারীদের মধ্যে শিক্ষা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জেলায় জেলায় স্ত্রী-শিক্ষা সম্মিলনী গঠন করেন।তাছাড়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিনি নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার প্রচার শুরু করেন এবং গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে ঘুরে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।এখানেই শেষ নয়।তাঁর উদ্যোগে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গে ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয়, যেখানে প্রায় ১৩০০ ছাত্রী পড়াশোনা করতো।যদিও ইংরেজরা স্ত্রী-শিক্ষা বিস্তারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করলেও পরবর্তীকালে কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন-এর নতুন ডিরেক্টর গর্ডন ইয়ং নতুন স্কুলগুলিকে অর্থ বরাদ্দ করতে অস্বীকার করলে বিদ্যাসাগর প্রতিবাদ করে পরিদর্শক ও সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে ইস্তফা দেন। পরবর্তীকালে তিনি নিজ খরচে কলকাতায় ‘মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন’ প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে ‘বিদ্যাসাগর কলেজ’ নামে পরিচিত।

এর পাশাপাশি, তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে রাজনৈতিক ভাবেও সচেতন হতে হবে। রাজনৈতিক সচেতনতা না থাকলে জাতির ভাগ্য স্তব্ধ হয়ে যাবে। তাঁর নেপথ্য সহযোগিতায় ‘সোমপ্রকাশ’ নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই পত্রিকাই বাংলার প্রথম পত্রিকা—যেখানে রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। এছাড়াও ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু কাল। গণশিক্ষার প্রসারে তিনি যে লড়াই করেছিলেন, তা বাঙালি আজীবন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। তবে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত অবদান বোধহয় ‘বিধবা বিবাহ’ প্রবর্তন। নারীজাগরণে এই মহাপ্রাণ মানুষটির অবদান নিয়েই এই প্রবন্ধের অবতারণা।

বিদ্যাসাগরের অবদানের কথা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা দুষ্কর কিন্তু একথা বলা যেতেই পারে যে তিনি যে স্বপ্ন নিয়ে সর্বশিক্ষার মাধ্যমে সমাজ গঠনের চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলেন তাঁর লেস মাত্র আজকের সমাজে প্রতিফলিত হয়না। আজ আমরা এমন এক সমাজব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করি যেখানে সবাই সবার প্রতিদ্বন্দ্বী, একটা প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে সবাই ব্যস্ত। শুধু তাই না আমাদের পরস্পরের সম্পর্ক নির্ভর করে আমরা কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক সেই হিসেবে। একদিন যে মানুষটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন গোটা সমাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন আজকের পশ্চিমবঙ্গবাসী দেখছে কিভাবে শাসক দল মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে নিজেদের রাজনৈতিক লাভের বন্দোবস্ত করছে।

যিনি নারীর সর্বোত্তম বিকাশের কথা মাথায় রেখে তাদের শিক্ষার প্রদানের জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন কিন্তু তাঁরই মর্মর মূর্তি আজ রাজনৈতিক জমি তৈরির লড়াইয়ের কারণে শিক্ষা প্রাঙ্গনে ভুলুন্ঠিত। বাঙালির এর থেকে বড়ো লজ্জা আর কি হতে পারে? সেই ঘটনার পরে এক বছর অতিক্রম হয়ে গেছে কিন্তু এই জঘন্য অপরাধের পিছনে কারা ছিল তা আজ অবধি এই সরকার চিহ্নিত করতে পারেনি। তারা শুধু মাত্র বিজেপিকে দোষারোপ করেই নিজের ব্যর্থতা ঢেকেছেন। আজ থেকে দেড়শো বছর আগে বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক উত্তরণের অঙ্গীকার করেছিলেন আর সেই নারী জাতির কি হাল আমাদের রাজ্যে?

অনেক হয়তো ভেবেছিলেন রাজনীতিতে ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে একজন নারী মুখ্যমন্ত্রীর পদভার গ্রহণ করলে এরাজ্যের মহিলারা শুধু সুরক্ষিত নন, তারা সব দিক দিয়ে লাভবান হবেন কিন্তু আজ তৃণমূলের ৯ বছরের শাসনকালে তারা কি সেই দাবি করতে পারেন? আজ আমাদের রাজ্য নারী নির্যাতন, নারী পাচারে অন্য রাজ্যের তুলনায় অনেক এগিয়ে কিন্তু নারী সুরক্ষা থেকে নারী শিক্ষাই একবারে নিচের দিকে। যদি একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী এই রাজ্যের নারীদের সামান্যতম আশার আলো দেখাতে না পারেন তাহলে কি ফ্রিতে একটা সাইকেল দিয়েই দায় সারা যায়? এর জবাব তো মমতা ব্যানার্জী কে দিতে হবে। শুধু কি তাই? আমাদের রাজ্যে নারীদের উপর যে পরিমাণ অপরাধ এই গত ৯ বছরে ঘটেছে সেসব কথা ভাবলে গা শিউরে ওঠে। সে কামদুনির সেই হতভাগ্য যুবতী হোক বা পার্ক স্ট্রিটের চলন্ত গাড়ির ধর্ষিতার আত্মা আজ বিচারের অপেক্ষায়,কিন্তু শাসক নির্বিকার। এই ধরণের সামাজিক অবক্ষয় বাংলার মানুষকে প্রতিদিন একটু একটু করে পিছিয়ে দিচ্ছে আর আমাদের আগামী প্রজন্মের ভাগ্যে কি আছে তা ভগবানই জানেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে বর্তমান শাসক বাংলা মায়ের যা অপমান করেছে তাঁর যোগ্য জবাব পরের বছর এই রাজ্যের মানুষ গণতান্ত্রিক উপায়ে দেবে।

একথা ঠিক যে নারীদের যোগ্য সম্মান দিয়ে তাদের সমাজ গঠনের কাজে আমরা ঠিক মতো এখনো লাগাতে পারিনি এবং তাই আজও তাদের অবমাননা, অবমূল্যায়ন নিয়েই প্রতিনিয়িত বেঁচে থাকতে হয়। যদি সামাজিক পরিবর্তন আনতেই হয় তাহলে নারীদের প্রাপ্য সম্মান আমাদের নিশ্চিত করতে হবে আর তাহলেই হবে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রতি আমাদের সঠিক সম্মান প্রদর্শন। একথা আজ প্রমাণিত যে তৃণমূল সরকার সামাজিক সুরক্ষা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ আর যদি ‘রাম ভরসাই’ বাংলার মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় তাহলে ‘২১ বিজেপির হাত ধরেই সেই রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন হবে এই আশা রাখি।